Wednesday, August 26, 2026

ওপারেই টিকে থাকার লড়াইটা অন্যরকম | On the other side

যে পুরোনো বাড়ির দক্ষিণ দিকের ঘরটাতে আমি থাকি, তার এক ধরনের নিজস্ব বিষণ্ণতা আছে। জরাজীর্ণ মেঝের নোন্তা গন্ধ আর পুরোনো কাঠের জানালার ঘুণধরা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে জমে থাকে অতীত দিনের নীরবতা। সেই জানালায় দাঁড়ালে, সোজা দূরে একটা গা ছমছমে মৃত্যুকূপ চোখে পড়ে। যেন এক নীরব গহ্বর অন্ধকারের চাদর মুড়ি দিয়ে হাঁ করে অপেক্ষা করছে। সেই হিসেবে ধরে নেওয়া যায়, মৃত্যু কোনো সুদূর ভবিষ্যতের বিষয় নয়, ওটা একেবারে আমাদের দৃষ্টিসীমানার মাঝেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ কী তীব্র বিতৃষ্ণায়, কী অন্ধ মোহে আমরা বেঁচে থাকার নিত্যনতুন স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকি! কালকের নতুন কোনো প্রাপ্তির আশায়, মিছে কোনো আশ্বাসের ওপর ভর করে প্রতিদিন নিজেদের ভুলিয়ে রাখি।




এখন এখানে গভীর রাত। রাত বলাও বোধহয় পুরোপুরি ঠিক হবে না; বাতাসের ভিজে আমেজ আর দিগন্তের ধোঁয়াটে ভাব জানান দিচ্ছে এটি সম্ভবত ভোররাত। শেষ রাতের এই নীরবতায় ক্যাম্পাসের দিকে পা বাড়ালেই হয়তো কোনো না কোনো জাগ্রত প্রাণকে পেয়ে যাব। লাইব্রেরির পাশের নির্জন মোড়ে কিংবা মেহগনি গাছের ছায়ায় কাউকে না কাউকে পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ভেতরে এমন এক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে যে মনটা একদম দিশেহারা, দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য।

নিজের ভেতরে এই তীব্র অস্থিরতার মাঝে চারপাশের মানুষকে দেখলে অবাক হতে হয়। কেউবা জীবনকে খুব সাধারণ নিয়মে, কোনো জটিলতা ছাড়াই তার নিজের মতো করে যাপন করে যাচ্ছে। যেন কোনো ঝড়ই তাকে ছোঁয়নি। আবার কেউ হয়তো নিজের অপ্রকাশিত খারাপ লাগা আর বুকের ভেতরের গভীর দুঃখ ভুলতে নিজেকে নিয়ে যাচ্ছে অন্য কোনো ভুবনে; আচ্ছন্নতার এমন এক গহ্বরে, যেখানে বাস্তবতার কোনো ধার নেই।

অথচ এই নিস্তব্ধতার ঠিক ওপারেই টিকে থাকার লড়াইটা অন্যরকম। কত মানুষ ভোরের আলো ফোটার আগেই রাস্তায় নেমে পড়ছে জীবিকার তাগিদে, স্রেফ একমুঠো অন্নের সংস্থানে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য। তাদের কাছে প্রতিটা সকাল এক নির্মম যুদ্ধ। অথচ অদ্ভুত বিষয় হলো, এখানে এই ছায়াবৃত আঙিনায় বেঁচে থাকাটাই যেন সবচেয়ে সহজ, সবচেয়ে সাধারণ এক ঘটনা। ক্ষুধা মেটানো কিংবা ঘুমিয়ে পড়া, এর চেয়ে সহজ আর কী হতে পারে? কিন্তু এই পরম সহজ বেঁচে থাকার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে গহীন শূন্যতা। মৃত্যুকূপটা জানালার ওপার থেকে প্রতিদিন নীরবে হাতছানি দিয়ে চিনে নেয় আমাদের আড়াল, আর আমরা এক বুক ক্লান্তি নিয়ে বেঁচে থাকার অভিনয়টা চালিয়ে যাই।




Share: