সাদিকা একদিন দুপুরে রায়হান স্যারের অফিসে গেল। তার মনে অনেক প্রশ্ন জমেছে—গবেষণা কীভাবে শুরু হয়? প্রথম প্রশ্ন কী ছিল? আর দর্শন বা ফিলোসফি গবেষণার সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত? রায়হান স্যার একটু হেসে বললেন, “সাদিকা, গবেষণা আসলে কেবল তথ্য সংগ্রহ আর বিশ্লেষণ নয়। এটি হলো চিন্তা, প্রশ্ন এবং জ্ঞানের গভীরে যাওয়ার এক অসাধারণ যাত্রা। এই যাত্রায় দর্শন বা ফিলোসফি হলো তোমার প্রথম দিশারী।”
“গবেষণার দর্শন (Philosophy of Research) হলো সেই কাঠামো, যা তোমাকে শেখায় কীভাবে সঠিক প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয় এবং কীভাবে জ্ঞানের সত্যতা যাচাই করতে হয়,” স্যার বললেন।
তিনি ব্যাখ্যা করলেন, “আমরা মানুষ, আমাদের চিন্তা এবং প্রশ্ন করার ক্ষমতা আমাদের গবেষণার শুরুর বিন্দু। প্রথম দর্শনের প্রশ্ন ছিল— ‘আমরা কে? আমরা কেন আছি?’ এই প্রশ্ন থেকেই জ্ঞানের বিস্তার শুরু। রায়হান স্যার সাদিকাকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, “সাদিকা, গবেষণার আসল সৌন্দর্য তখনই বোঝা যায়, যখন তুমি গবেষণার দর্শন বা রিসার্চ ফিলোসফি সম্পর্কে গভীর ধারণা লাভ করো। গবেষণা কেবল ডেটা সংগ্রহ বা বিশ্লেষণ নয়; এটি একটি চিন্তা, একটি দৃষ্টিভঙ্গি, এবং একটি সত্যকে উপলব্ধি করার প্রয়াস।”
তোমাকে জানতে হবে গবেষণার দর্শনের মূলে কী আছে? স্যার ব্যাখ্যা করলেন, “প্রথম প্রশ্নটি হলো, আমরা কী জানতে চাই? আমরা কেন জানতে চাই? এবং আমরা যেভাবে জানছি তা কি সঠিক? এই প্রশ্নগুলো থেকেই গবেষণার দর্শনের শুরু। গবেষণা করার জন্য এই দার্শনিক প্রশ্নগুলো বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো তোমার চিন্তার কাঠামো তৈরি করে। রিসার্চ ফিলোসফি হলো সেই ভিত্তি যা তোমার গবেষণার পদ্ধতি এবং প্রয়োগের উপর প্রভাব ফেলে।”
গবেষণার দর্শন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
গবেষণার দর্শন কেন গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝাতে রায়হান স্যার এক কাপ চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “গবেষণার দর্শন না বুঝলে তুমি আসলে কখনোই জানতে পারবে না কেন একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি ব্যবহার করছো। এটি শুধু গবেষণার কাঠামো নয়, বরং গবেষণার নীতিগত ভিত্তি।”
তিনি ব্যাখ্যা করলেন, “রিসার্চ ফিলোসফি বোঝা মানে হলো তিনটি মৌলিক বিষয় উপলব্ধি করা:
প্রথমটি হলো গবেষণার পদ্ধতি বেছে নেওয়ার সঠিক কারণ খুঁজে পাওয়া। স্যার বললেন, “তুমি যখন একটি গবেষণা পরিচালনা করছো, তখন তোমার সামনে বিভিন্ন পদ্ধতি থাকে। তুমি কীভাবে জানবে কোনটি সঠিক? রিসার্চ ফিলোসফি তোমাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। এটি বলে দেয়, তুমি যে পদ্ধতি বেছে নিচ্ছো, তা কীভাবে তোমার গবেষণার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।”
দ্বিতীয়টি হচ্ছে, নতুন প্রশ্ন তৈরি করা এবং তাদের উত্তর খোঁজা। স্যার তার টেবিলের উপর থেকে একটি কলম তুলে বললেন, “গবেষণার মূল ভিত্তি হলো প্রশ্ন। তুমি কিভাবে জানবে কোন প্রশ্ন করা উচিত? এবং সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কীভাবে এগোবে? রিসার্চ ফিলোসফি তোমাকে শিখাবে কীভাবে চিন্তা করতে হয়, এবং কীভাবে একটি প্রশ্ন তৈরি করতে হয় যা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে পারে।”
সবশেষ বিষয়টি হলো বাস্তবতার প্রকৃতি এবং আমাদের জ্ঞানের সীমানা নিয়ে ভাবা। স্যার গম্ভীরভাবে বললেন, “গবেষণা মানেই হলো বাস্তবতাকে বোঝার চেষ্টা। কিন্তু বাস্তবতা কী? এটি কি নির্দিষ্ট এবং নিরপেক্ষ, নাকি এটি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভরশীল? রিসার্চ ফিলোসফি এই গভীর প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে সাহায্য করে।” তিনি উদাহরণ দিলেন, “একজন গবেষক যদি মনে করেন যে বাস্তবতা নির্দিষ্ট এবং মাপযোগ্য, তবে তিনি পরিমাণগত পদ্ধতি ব্যবহার করবেন। অন্যদিকে, যদি তিনি বিশ্বাস করেন যে বাস্তবতা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা নির্মিত, তাহলে তিনি গুণগত পদ্ধতির দিকে ঝুঁকবেন।”
গবেষণার দর্শনের মূল প্রশ্ন
রায়হান স্যার বোর্ডে তিনটি শব্দ লিখলেন: Ontology, Epistemology, Methodology। তারপর বললেন, “এই তিনটি শব্দ গবেষণার ভিত্তি। যদি তুমি সত্যিকারের গবেষণা করতে চাও, তাহলে এদের অর্থ ভালোভাবে বুঝতে হবে।” সাদিকা একটু ভয়ে ভয়ে বলল, “স্যার, এগুলো অনেক কঠিন মনে হচ্ছে।” স্যার মুচকি হেসে বললেন, “ঠিক আছে, আমি সহজ ভাষায় বোঝাই।”
Ontology (অন্ততত্ত্ব): সত্যের প্রকৃতি
Ontology বা অন্ততত্ত্ব হলো সত্য এবং বাস্তবতার প্রকৃতি নিয়ে অনুসন্ধান। এটি এমন একটি ধারণা, যা আমাদের শেখায় পৃথিবী এবং তার বিষয়বস্তু আসলে কেমন। এই দর্শনের মূল কাজ হলো সত্য কী এবং তা কীভাবে কাজ করে, তা বোঝা।
রায়হান স্যার সাদিকাকে বললেন, “Ontology মানে হলো বাস্তবতা এবং সত্যের মূল প্রশ্ন করা। তুমি যখন জানতে চাও, বায়ুদূষণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কিনা, তখন তুমি Ontology নিয়ে কাজ করছ। এখানে তুমি বুঝতে চাচ্ছ, সত্যটি আসলে কী এবং এটি সবার জন্য সমান কিনা।”
স্যার আরও ব্যাখ্যা করলেন যে, Ontology আমাদের এই জিজ্ঞাসার দিকে নিয়ে যায় যে সত্যটি কি নির্দিষ্ট এবং সর্বজনীন, নাকি এটি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এবং অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে।
এই প্রসঙ্গে দুটি দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমটি হলো Objectivism বা উদ্দেশ্যবাদ। এটি বিশ্বাস করে যে সত্য সর্বজনীন এবং সবার জন্য একই। Objectivism অনুযায়ী, সত্য বাস্তব এবং এটি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বা অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে না। উদাহরণ হিসেবে স্যার বললেন, “বায়ুদূষণ সবার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর—এটি একটি Objectivist দৃষ্টিভঙ্গি। এখানে সত্য একটি নির্দিষ্ট এবং পরিমাপযোগ্য বিষয়।” Objectivism এমন বাস্তবতাকে তুলে ধরে, যা নিরপেক্ষ এবং সুনির্দিষ্ট। এটি জোর দেয় যে সত্য কোনো ব্যক্তিগত বা সাংস্কৃতিক ভিন্নতায় পরিবর্তিত হয় না।
অন্যদিকে, Constructivism বা নির্মাণবাদ বলে যে, সত্য সবার জন্য এক নাও হতে পারে। এটি মানুষের অভিজ্ঞতা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং সামাজিক বা সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে ভিন্ন হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একজন বয়স্ক ব্যক্তি হয়তো বায়ুদূষণের কারণে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন, কিন্তু একজন যুবক হয়তো একই দূষণ সহজেই সহ্য করতে পারেন। এখানে Constructivism মনে করে, বাস্তবতা এবং সত্য মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সামাজিক প্রভাবের উপর নির্ভরশীল।
স্যার বলেন, “Ontology হলো গবেষণার গভীরতম স্তর। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে সত্য এবং বাস্তবতার মূল ধারণাগুলোকে প্রশ্ন করতে হয়। তুমি যদি সত্যকে একটি নিরপেক্ষ, সবার জন্য একই বিষয় হিসেবে দেখতে চাও, তাহলে Objectivist দৃষ্টিভঙ্গি কাজে লাগবে। কিন্তু যদি তুমি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সত্যের প্রকৃতি বুঝতে চাও, তাহলে Constructivist দৃষ্টিভঙ্গি উপযুক্ত হবে।”
Ontology আমাদের গবেষণার ভিত্তি স্থাপন করে। এটি বোঝা প্রয়োজন, কারণ এটি নির্ধারণ করে যে আমাদের গবেষণার লক্ষ্য কী এবং আমরা বাস্তবতা বা সত্য সম্পর্কে কীভাবে চিন্তা করবো।
Epistemology (জ্ঞানতত্ত্ব): আমরা কীভাবে জানি যে সত্য আসলেই সত্য?
Epistemology বা জ্ঞানতত্ত্ব হলো এমন একটি ধারণা যা আমাদের শেখায় কীভাবে আমরা জানবো যে আমাদের জ্ঞান সঠিক এবং সত্য। এটি জিজ্ঞাসা করে, জ্ঞান কীভাবে আসে এবং সত্য প্রমাণ করার জন্য আমরা কোন পদ্ধতি ব্যবহার করবো। এটি মূলত জ্ঞানের উৎস এবং প্রমাণের প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করে।
রায়হান স্যার সাদিকাকে বললেন, “তুমি যদি বলো, ‘বায়ুদূষণ শ্বাসতন্ত্রের রোগ সৃষ্টি করে,’ তাহলে প্রশ্ন উঠবে, তুমি কীভাবে জানলে? তুমি কি মানুষের অভিজ্ঞতা শুনে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছো, নাকি মেডিকেল রিপোর্ট দেখে নিশ্চিত হয়েছো?” Epistemology আমাদের শেখায় যে আমরা তথ্য বা ডেটা কোথা থেকে সংগ্রহ করবো এবং সেগুলো কীভাবে যাচাই করবো।
এখানে মূলত দুটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। প্রথমটি হলো Positivism বা ইতিবাচকতাবাদ, যেখানে জ্ঞান আসে পরিসংখ্যানিক ডেটা বা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে। উদাহরণস্বরূপ, তুমি যদি বায়ুদূষণের প্রভাব মাপতে পরিসংখ্যানিক পদ্ধতি ব্যবহার করো এবং সুনির্দিষ্ট ডেটা বিশ্লেষণ করো, তবে এটি Positivist পদ্ধতির উদাহরণ। এই পদ্ধতিতে সবকিছু নিরপেক্ষ এবং মাপযোগ্য।
অন্যদিকে, দ্বিতীয়টি হলো Interpretivism বা ব্যাখ্যাত্মক পদ্ধতি, যেখানে জ্ঞান মানুষের অভিজ্ঞতা এবং দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আসে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি তুমি মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়ে জানার চেষ্টা করো যে তারা বায়ুদূষণকে কীভাবে অনুভব করে এবং কীভাবে তারা এই সমস্যার সঙ্গে মানিয়ে নেয়, তাহলে এটি Interpretivist পদ্ধতির উদাহরণ। এখানে জ্ঞান মানে শুধুমাত্র ডেটা নয়, বরং মানুষের ভাবনা, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতার উপর নির্ভরশীল।
স্যার বললেন, “Epistemology হলো প্রমাণের প্রক্রিয়া। এটি বোঝায় যে তুমি ডেটা কোথা থেকে সংগ্রহ করবে, কীভাবে তা যাচাই করবে, এবং সত্যের সঙ্গে সেই ডেটার সম্পর্ক কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।”
এই দৃষ্টিভঙ্গিগুলো বুঝে নেওয়া গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি নির্ধারণ করে যে গবেষণার পদ্ধতি কেমন হবে এবং সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য কোন পথে এগোনো উচিত। Epistemology শুধুমাত্র প্রমাণের মাধ্যম নয়, বরং জ্ঞানের গভীরতা এবং সঠিকতা যাচাইয়ের একটি মৌলিক দর্শন।
Methodology (পদ্ধতিতত্ত্ব): গবেষণার কৌশল
Methodology, বা পদ্ধতিতত্ত্ব, হলো গবেষণার এমন একটি অংশ যেখানে তুমি ঠিক করবে কীভাবে তোমার গবেষণা পরিচালনা করবে। এটি গবেষণার রোডম্যাপ হিসেবে কাজ করে, যা তোমাকে বলে দেয় তথ্য কীভাবে সংগ্রহ করা হবে এবং কীভাবে তা বিশ্লেষণ করা হবে।
রায়হান স্যার বললেন, “Methodology হলো তোমার গবেষণার কাঠামো। এটি নির্ধারণ করে তোমার কাজের প্রতিটি ধাপ। তুমি যদি জানতে চাও বায়ুদূষণ মানুষের স্বাস্থ্যের উপর কীভাবে প্রভাব ফেলে, তাহলে প্রথমেই ঠিক করতে হবে তুমি তথ্য কীভাবে সংগ্রহ করবে। তুমি কি মানুষের অভিজ্ঞতা জানার জন্য সাক্ষাৎকার নেবে, নাকি হাসপাতালের রিপোর্ট বিশ্লেষণ করবে?”
তিনি আরও ব্যাখ্যা করলেন, Methodology প্রধানত দুটি পদ্ধতিতে বিভক্ত: Quantitative এবং Qualitative। Quantitative পদ্ধতিতে তুমি সংখ্যাগত ডেটা নিয়ে কাজ করবে। উদাহরণ হিসেবে স্যার বললেন, “ধরো, তুমি জানতে চাও কতজন মানুষ বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। এর জন্য তুমি হাসপাতালের রিপোর্ট বিশ্লেষণ করবে বা একটি বড় পরিসরে সমীক্ষা চালাবে। এই পদ্ধতিতে সংখ্যা এবং পরিসংখ্যানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং ফলাফল স্পষ্টভাবে উপস্থাপনযোগ্য।”
অন্যদিকে, Qualitative পদ্ধতিতে তুমি মানুষের অভিজ্ঞতা এবং দৃষ্টিভঙ্গি জানবে। এটি একটি গভীরতর এবং সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। স্যার উদাহরণ দিয়ে বললেন, “তুমি যদি জানতে চাও, মানুষ বায়ুদূষণ নিয়ে কীভাবে অনুভব করে বা তাদের জীবনে এটি কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তাহলে তোমাকে তাদের সাথে কথা বলতে হবে। তাদের অনুভূতি, মতামত এবং চিন্তাধারা সংগ্রহ করতে হবে। এই পদ্ধতিতে সংখ্যার চেয়ে মানুষের কথার উপর জোর দেওয়া হয়।”
Methodology হলো গবেষণার মেরুদণ্ড। এটি শুধু তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিই নির্ধারণ করে না, বরং এটি গবেষণার মান নিশ্চিত করে। যদি তোমার Methodology সঠিক হয়, তবে তুমি এমন তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে, যা গবেষণার প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর দিতে সক্ষম। Methodology ছাড়া একটি গবেষণা অগোছালো এবং অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। এটি শুধু একটি পদ্ধতি নয়; এটি গবেষণার মূল কাঠামো, যা তোমার চিন্তা এবং কাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।
প্রথম প্রশ্ন এবং গবেষণার শুরু
রায়হান স্যার সাদিকাকে বোঝালেন, “প্রথম প্রশ্ন সবসময় গভীর এবং বহুমাত্রিক ছিল। জ্ঞান এবং গবেষণার যাত্রা সেই প্রশ্নগুলো থেকে শুরু, যা মানুষ তার অস্তিত্ব নিয়ে জানতে চেয়েছে। প্রাচীন দার্শনিক প্লেটো, অ্যারিস্টটল, এবং সক্রেটিসের মতো মনীষীরা প্রথম এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হন। তাঁরা মানব সমাজ, পৃথিবী, এবং এই মহাবিশ্ব নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করেছিলেন।”
স্যার বোঝালেন, “প্রথম প্রশ্নগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল বাস্তবতা এবং আমাদের অস্তিত্বকে বোঝা। প্লেটো জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আমরা কোথা থেকে এলাম?’ অ্যারিস্টটল গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছিলেন, ‘এই জগৎ কী?’ এবং সক্রেটিসের প্রশ্ন ছিল, ‘জ্ঞানের উৎস কী?’ এই প্রশ্নগুলো শুধু তত্ত্ব নয়; এগুলো মানব জ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছে।”
সাদিকা একটু অবাক হয়ে বলল, “স্যার, এই প্রশ্নগুলো তো খুব সাধারণ মনে হয়। কিন্তু এগুলো থেকে কীভাবে এত বড় জ্ঞানশৃঙ্খলার সৃষ্টি হলো?”
স্যার একটু হেসে বললেন, “সাধারণ প্রশ্ন থেকেই অসাধারণ উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন, ‘আমরা কোথা থেকে এলাম?’ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সৃষ্টি হলো Ontology বা অন্ততত্ত্ব। এটি বোঝার চেষ্টা করে, বাস্তবতা কীভাবে কাজ করে। ‘এই জগৎ কী?’ প্রশ্নের উত্তরে তৈরি হলো Epistemology বা জ্ঞানতত্ত্ব। এটি বুঝতে চায়, আমরা কীভাবে জানবো যে আমাদের জানা সত্য। আর ‘জ্ঞানের উৎস কী?’ এই প্রশ্ন থেকে জন্ম নিলো Methodology বা পদ্ধতিতত্ত্ব। এটি নির্ধারণ করে, আমরা কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করবো এবং বিশ্লেষণ করবো।”
স্যার উদাহরণ দিলেন, “ধরো, সক্রেটিস যদি প্রশ্ন না করতেন, ‘সত্য কী?’ তাহলে আজকে আমরা Objectivism আর Constructivism নিয়ে কথা বলতাম না। প্লেটো যদি প্রশ্ন না তুলতেন, ‘আমাদের জগৎ কি একটাই, নাকি এটি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভর করে?’ তাহলে Ontology সম্পর্কে এত গভীর আলোচনা কখনোই হতো না।”
তিনি আরও যোগ করলেন, “এই প্রশ্নগুলো শুধু দর্শনের ক্ষেত্রেই নয়, বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায়ও তাদের ছাপ রেখেছে। নিউটন, গ্যালিলিও, ডারউইন—তাঁরাও এই প্রথম প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই নিজেদের গবেষণাকে এগিয়ে নিয়েছেন। যেমন, ‘পৃথিবী কি সূর্যের চারপাশে ঘোরে?’—এটি একটি Ontological প্রশ্ন, যা বিজ্ঞানকে নতুন দিকে নিয়ে গেছে।”
স্যার বললেন, “তুমি যদি সত্যিকারের গবেষক হতে চাও, তবে এই প্রথম প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবা তোমার জন্য অপরিহার্য। এগুলো শুধু জ্ঞানের ভিত্তি নয়, এগুলোই গবেষণার মূল চালিকা শক্তি।”
সাদিকা গভীর মনোযোগে শুনল। সে বুঝতে পারল, গবেষণা মানে কেবল তথ্য সংগ্রহ বা বিশ্লেষণ নয়। গবেষণা মানে হলো, সেই প্রাথমিক প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করা, যা মানুষকে যুগ যুগ ধরে ভাবিয়ে তুলেছে।
গবেষণার দর্শনের ব্যবহারিক প্রয়োগ
রায়হান স্যার সাদিকাকে বোঝালেন, “গবেষণার দর্শন কেবল তাত্ত্বিক বিষয় নয়; এটি গবেষণার প্রতিটি ধাপে ব্যবহারিক প্রয়োগে গুরুত্বপূর্ণ। তোমার গবেষণার বিষয় যদি হয় ‘শহরের বায়ুদূষণ কীভাবে মানুষের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে,’ তাহলে তোমাকে গবেষণার দর্শন ব্যবহার করতে হবে তিনটি ধাপে—Ontology, Epistemology, এবং Methodology। প্রতিটি ধাপ তোমার গবেষণার ভিত্তি তৈরি করবে।”
স্যার উদাহরণ দিয়ে বললেন, “তুমি প্রথমে Ontology দিয়ে শুরু করবে। এখানে তোমাকে নির্ধারণ করতে হবে, তুমি কোন বাস্তবতাকে নিয়ে কাজ করছো। তুমি বলবে, ‘বায়ুদূষণ একটি বাস্তব সমস্যা এবং এটি মানুষের জন্য ক্ষতিকর।’ এটি তোমার গবেষণার ভিত্তি হবে, কারণ তুমি সিদ্ধান্ত নিচ্ছ যে বায়ুদূষণের প্রভাব একটি সর্বজনীন সত্য।”
এরপর স্যার বললেন, “এখন আসবে Epistemology। এখানে তুমি জানার পদ্ধতি ঠিক করবে। তুমি বলবে, ‘আমরা কীভাবে জানবো যে বায়ুদূষণ মানুষের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে?’ তোমার উত্তর হবে, ‘আমরা ডেটা সংগ্রহ করব, যেমন—মেডিকেল রিপোর্ট, রোগীদের সাক্ষাৎকার, বা দূষণের মাত্রা পরিমাপ।’ এটি প্রমাণের উপায় নিশ্চিত করবে যে তোমার গবেষণার ফলাফল গ্রহণযোগ্য।”
সবশেষে স্যার ব্যাখ্যা করলেন Methodology। “এখন তোমাকে নির্ধারণ করতে হবে, তুমি কোন পদ্ধতিতে কাজ করবে। তুমি সিদ্ধান্ত নিতে পারো, ‘আমি একটি সার্ভে করব, যেখানে আমি ২০০ জন অংশগ্রহণকারীর স্বাস্থ্য তথ্য সংগ্রহ করব এবং সেটি বিশ্লেষণ করব।’ অথবা তুমি বলতে পারো, ‘আমি সরকারি রিপোর্ট এবং ল্যাবরেটরির তথ্য ব্যবহার করব।’ Methodology হলো সেই ধাপ, যেখানে গবেষণার পুরো কাঠামো গড়ে ওঠে।”
স্যার আরও বললেন, “এই তিনটি ধাপ একত্রে তোমার গবেষণাকে সুনির্দিষ্ট এবং গ্রহণযোগ্য করবে। যদি তুমি Ontology-তে ঠিক না করো যে বায়ুদূষণ বাস্তব, তবে তোমার Epistemology এবং Methodology নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে যাবে। একইভাবে, যদি Epistemology ঠিক না করো, তাহলে তুমি জানতেই পারবে না কোন পদ্ধতি দিয়ে সত্য যাচাই করতে হবে। আর Methodology ছাড়া গবেষণার রোডম্যাপই তৈরি হবে না।”
সাদিকা বুঝতে পারল, গবেষণার দর্শন মানে শুধু তত্ত্ব নয়; এটি গবেষণার প্রতিটি ধাপে প্রাসঙ্গিক এবং জরুরি। Ontology, Epistemology, এবং Methodology সঠিকভাবে নির্ধারণ করলেই তার গবেষণার ভিত্তি শক্তিশালী হবে। সাদিকা ভাবতে শুরু করল, তার নিজের গবেষণায় এই তিনটি ধাপ কীভাবে প্রয়োগ করবে।
দর্শনের জ্ঞান কেন জরুরি?
রায়হান স্যার চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বললেন, “গবেষণায় দর্শনের জ্ঞান জরুরি কেন জানো? কারণ এটি কেবল জ্ঞানের শাখাগুলোর ভিত্তি নয়, বরং এটি তোমাকে শেখায় কীভাবে গভীরভাবে চিন্তা করতে হয়। গবেষণায় সঠিক দিকনির্দেশনা পেতে হলে দর্শনকে পুরোপুরি ধারণ করতে হবে। এটি তোমাকে শেখায় সঠিক প্রশ্ন কীভাবে করতে হয়, সত্য এবং মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে, এবং গবেষণার জন্য উপযুক্ত পদ্ধতি নির্বাচন করতে।”
তিনি উদাহরণ দিলেন, “তুমি যদি জানতে চাও, ‘কেন কিছু মানুষ বায়ুদূষণ সহ্য করতে পারে আর অন্যরা পারে না,’ তাহলে দর্শনের সাহায্যে তুমি প্রথমে বুঝতে পারবে, এই প্রশ্নটি আসলে Ontology-র মধ্যে পড়ে। তুমি ভাববে, ‘মানুষের সহ্যশক্তির প্রকৃতি কী?’ এরপর Epistemology-র মাধ্যমে তুমি জানবে, এই প্রশ্নের উত্তর পেতে কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করতে হবে—ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নাকি মেডিকেল রিপোর্ট। এবং Methodology-তে তুমি সিদ্ধান্ত নেবে, ‘আমি কোন পদ্ধতিতে এই তথ্য সংগ্রহ করব এবং বিশ্লেষণ করব।’”
স্যার আরও যোগ করলেন, “গবেষণার দর্শন তোমাকে শেখায় শুধু তথ্য সংগ্রহ করলেই চলবে না; সেই তথ্য কীভাবে সত্য এবং প্রাসঙ্গিক হতে পারে তা নির্ধারণ করতে হবে। তুমি যদি দর্শনের দিক থেকে চিন্তা করতে না জানো, তাহলে হয়তো তুমি প্রশ্ন করবে, কিন্তু সঠিক উত্তর খুঁজে পাবে না।”
তিনি একটি বাস্তব উদাহরণ দিলেন, “ধরো, তুমি শহরের বিভিন্ন অঞ্চলের বায়ুদূষণের মাত্রা নিয়ে কাজ করছ। তুমি ভাবছ, ‘বায়ুদূষণ কি সব জায়গায় সমানভাবে ক্ষতিকর?’ দর্শন এখানে তোমাকে সাহায্য করবে সত্যের প্রকৃতি বোঝাতে। তুমি বুঝবে, এটি Objectivism হলে তুমি বলবে, ‘বায়ুদূষণ সবার জন্য সমান ক্ষতিকর।’ আর যদি Constructivism হয়, তুমি ভাববে, ‘এই প্রভাব ভিন্ন ভিন্ন মানুষের জন্য ভিন্ন হতে পারে।’”
স্যার বললেন, “গবেষণার দর্শন ছাড়া তুমি আসলেই বুঝতে পারবে না, তোমার কাজের মূল ভিত্তি কী। এটি তোমাকে গভীরভাবে চিন্তা করার শক্তি দেয়, এবং তুমি সঠিক পথে এগিয়ে যেতে পারো। এক কথায়, দর্শনের জ্ঞান গবেষণার আত্মা।”
রায়হান স্যার চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে বললেন, “গবেষণা কখনোই কেবল তথ্য সংগ্রহ নয়। এটি হলো সত্যকে খুঁজে পাওয়ার একটি গভীর যাত্রা। গবেষণার দর্শন তোমাকে শেখাবে শুধু কীভাবে প্রশ্ন করতে হয় বা কীভাবে উত্তর পেতে হয় তা নয়, বরং শেখাবে কীভাবে তুমি নিজের সাথে, নি জের চিন্তাধারার সাথে পরিচিত হবে। সত্যিকারের গবেষণা তখনই সম্ভব, যখন তুমি নিজের সীমানা অতিক্রম করতে পারবে।”
সাদিকা গভীর মনোযোগ দিয়ে স্যারের কথা শুনল। আজ তার কাছে গবেষণার দর্শন কেবল একটি তাত্ত্বিক বিষয় নয়, এটি তার নিজের জীবন জানার এবং উপলব্ধি করার একটি নতুন দরজা খুলে দিল। সে মনে মনে ভাবল, “গবেষণা শুধু ডেটা বিশ্লেষণ নয়, এটি এমন একটি পথ যা আমাকে সত্যকে জানার পাশাপাশি নিজের অবস্থানও নির্ধারণ করতে সাহায্য করবে।”
স্যারের মুখে মৃদু হাসি, যেন তিনি বুঝতে পারছেন সাদিকার মনের ভাবনা। তিনি বললেন, “জ্ঞান অর্জনের পথ কখনোই সহজ নয়। কিন্তু যখন তুমি এর আসল স্বাদ পাবে, তখন দেখবে এটি তোমার জীবনকেই অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আর এটাই হলো গবেষণার আসল সৌন্দর্য।”
সেদিন সাদিকার মনে শুধু গবেষণার দর্শনের গুরুত্বই নয়, জীবনের নতুন অর্থও গভীরভাবে গেঁথে গেল।